খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ই জানুয়ারি ২০১৫, ৩:১৫ পিএম
একটি অঞ্চলের ভৌগোলিক মানচিত্র বা ম্যাপ কেবল তার প্রশাসনিক সীমানাকেই নির্দেশ করে না, বরং তা প্রকাশ করে সেই জনপদের কৌশলগত গুরুত্ব, বাণিজ্যিক সুবিধা এবং রাজনৈতিক অবস্থানকে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা যশোরের ম্যাপের দিকে তাকালে এর চারপাশের যে ভৌগোলিক সীমানা বা চৌহদ্দি দেখা যায়, তা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং আকর্ষণীয়।
Table of Contents

সীমানা ও ভূচিত্রের রূপরেখা: যশোর জেলার ম্যাপ ও চৌহদ্দি
একটি অঞ্চলের ভৌগোলিক মানচিত্র বা ম্যাপ কেবল তার প্রশাসনিক সীমানাকেই নির্দেশ করে না, বরং তা প্রকাশ করে সেই জনপদের কৌশলগত গুরুত্ব, বাণিজ্যিক সুবিধা এবং রাজনৈতিক অবস্থানকে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা যশোরের ম্যাপের দিকে তাকালে এর চারপাশের যে ভৌগোলিক সীমানা বা চৌহদ্দি দেখা যায়, তা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং আকর্ষণীয়।
যশোর জেলার প্রশাসনিক মানচিত্রের চারদিকের সীমানা নিচে সুবিন্যস্তভাবে তুলে ধরা হলো:
যশোরের এই সুনির্দিষ্ট চৌহদ্দি এবং ভৌগোলিক ম্যাপের কারণে ইতিহাসের বিভিন্ন সময় এই অঞ্চলটি অনন্য রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব পেয়ে এসেছে:
আজকের মানচিত্রে আমরা যে খণ্ডিত যশোর জেলাকে দেখি, সুদূর অতীতে এর ম্যাপ বা সীমানা এমন ছিল না। যুগের পর যুগ ধরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে এর মানচিত্র পরিবর্তিত হয়েছে:
| ঐতিহাসিক সময়কাল | ম্যাপ ও সীমানার বিস্তৃতি | রাজনৈতিক/প্রশাসনিক অবস্থা |
| ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ | মুড়লী ও কসবা কেন্দ্রিক অঞ্চল। | পীর খানজাহান আলী (র.) ও ১২ জন আউলিয়া কর্তৃক ইসলাম প্রচারের কেন্দ্র। |
| ১৫৫৫ খ্রিষ্টাব্দ | বর্তমান যশোর, খুলনা, বনগাঁ (ভারত) এবং কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরের অংশবিশেষ। | মহারাজ বিক্রমাদিত্য ও রাজা প্রতাপাদিত্যের স্বাধীন ‘যশোর রাজ্য’। |
| ১৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দ | নাটোরে রাজবাড়ির প্রশাসনিক সীমানা। | নাটোরের রানী ভবানীর জমিদারির অন্তর্ভুক্ত। |
| ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দ | বিশাল এক অবিভক্ত অঞ্চল (খুলনা, মাগুরা, ঝিনাইদহ, নড়াইলসহ)। | ব্রিটিশ আমলে একটি পৃথক জেলা হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ। |
| ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমান | উত্তর-ঝিনাইদহ/মাগুরা, দক্ষিণ-সাতক্ষীরা/খুলনা, পূর্ব-নড়াইল এবং পশ্চিমে ভারত। | ৪টি মহকুমা পৃথক জেলায় রূপান্তরিত হওয়ার পর বর্তমান খণ্ডিত ম্যাপ। |
যশোরের ম্যাপ বা ভূচিত্রের সাথে এর নামের উৎপত্তির এক গভীর ঐতিহাসিক ও লোকজ সম্পর্ক রয়েছে:
আরবি ‘জসর’ ও নদীমাতৃক রূপ: প্রাচীন ম্যাপ অনুযায়ী, এককালে যশোরের সর্বত্র নদীনালা, খাল-বিলে পরিপূর্ণ ছিল। আরবি শব্দ ‘জসর’ এর অর্থ সাঁকো। খ্রিষ্টীয় ১৩৯৮ সালের দিকে পীর খানজাহান আলী (র.) ভৈরব নদী পার হওয়ার জন্য একটি বিশাল বাঁশের সাঁকো বা ‘জসর’ নির্মাণ করে মুড়লীতে এসেছিলেন। এই জলময় ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এই অঞ্চলের নাম হয় ‘যশোর’ এবং মুড়লী সংলগ্ন ‘কসবা’ নামটিও তাঁরই দেওয়া।
গৌড়ের ‘যশ হরণ’ বা ‘যশোহর’: অন্য একটি সূত্র মতে, ষোড়শ শতকে গৌড়ের চরম রাজনৈতিক অরাজকতার সময় প্রতাপাদিত্যের পিতা বিক্রমাদিত্য ও বসন্ত রায় সুলতানের অঢেল ধনরত্ন অসংখ্য নৌকা বোঝাই করে গোপনে এই সুন্দরবন ঘেরা নিরাপদ অঞ্চলে নিয়ে আসেন। ফলে এই বন-জঙ্গলে আবৃত দুর্গম এলাকাটি এক সমৃদ্ধ রাজ্যে পরিণত হয়। প্রবাদ আছে, প্রাচীন রাজধানী গৌড়ের সমস্ত ‘যশ’ (গৌরব ও ঐশ্বর্য) ‘হরণ’ করে এই অঞ্চলের শ্রীবৃদ্ধি হয়েছিল বলেই এর নাম রাখা হয় ‘যশোহর’, যার আধুনিক রূপ আজকের ‘যশোর’।

১৮৬৪ সালে গঠিত দেশের অন্যতম প্রাচীন পৌরসভা, ১৮৩৮ সালের জিলা স্কুল কিংবা ১৮৫১ সালের পাবলিক লাইব্রেরির মতো ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো এই ম্যাপেরই একেকটি গৌরবময় বিন্দু। খণ্ডিত সীমানার জেলা হলেও, ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা এই ম্যাপটি আজও বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
মন্তব্য