খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই জানুয়ারি ২০১৫, ১২:৪০ পিএম
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এবং বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন জেলা যশোরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে এ অঞ্চলের নদ-নদীগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। গাঙ্গেয় বদ্বীপের পলি দিয়ে গঠিত এই জনপদের ভূ-প্রকৃতি গঠনে এবং মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে নদীগুলো মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। তবে কালের বিবর্তনে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবসৃষ্ট নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে যশোরের অনেক নদীই এখন তার চিরচেনা রূপ ও নাব্য হারাতে বসেছে। কপোতাক্ষ, ভৈরব কিংবা চিত্রার মতো ঐতিহাসিক নদীগুলো এখন ড্রেজিং ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধুঁকছে।

চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় মাথাভাঙ্গা নদী থেকে উৎপত্তি লাভ করা কপোতাক্ষ নদ যশোরের চৌগাছা দিয়ে এই জেলায় প্রবেশ করেছে। পরবর্তীতে ঝিকরগাছা, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এটি খুলনার পাইকগাছায় শিবসা নদীতে পতিত হয়েছে। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত এই নদটি একসময় ভীষণ প্রমত্তা ছিল। বর্তমানে কপোতাক্ষের নাব্য ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে খনন প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও নদীটির আশানুরূপ যৌবন আর ফেরেনি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নদী হলো চিত্রা। এটিও মাথাভাঙ্গা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে ঝিনাইদহ জেলার সীমানা পেরিয়ে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার জহুরপুর ইউনিয়নের ছুটুয়াকান্দি ও খাজুরা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে নড়াইলে প্রবেশ করেছে। শেষ পর্যন্ত নদীটি নবগঙ্গা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। কৃষিকাজ ও পণ্য পরিবহনের জন্য এই চিত্রা নদীটি বাঘারপাড়ার মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যশোর শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে ঐতিহাসিক ভৈরব নদ। সুন্দরবনের শিবসা নদী থেকে শুরু হয়ে অভয়নগরের নওয়াপাড়া ও যশোর সদরের বসুন্দিয়া আফ্রা হয়ে এর একটি শাখা নড়াইলে এবং মূল শাখাটি যশোর শহরের উপশহর, চুরমনকাঠি ও হৈবৎপুর ইউনিয়ন হয়ে ঝিনাইদহে প্রবেশ করেছে। একসময় এই নদী দিয়ে বড় বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত। বর্তমান সময়ে ভৈরব নদের ওপর অবৈধ দখলদারিত্ব এবং বর্জ্য ফেলার কারণে শহরের ভেতরের অংশটি প্রায় মৃতপ্রায় খালে পরিণত হয়েছে। নদীটি রক্ষায় স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদী হলো বেতনা বা বেতনা-কোদালিয়া। ঝিনাইদহ, যশোর ও সাতক্ষীরা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ১৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সর্পিলাকার নদীর গড় প্রস্থ ৫৫ মিটার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা পাউবো কর্তৃক নদীটির পরিচিতি নম্বর হলো ‘দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৬৪’। উৎপত্তিকালে এটি ভৈরব নদের শাখা হিসেবে ঝিনাইদহের মহেশপুর থেকে বের হলেও বর্তমানে সেই উৎসমুখটি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। মহেশপুরের বিভিন্ন বিলের পানি ধারণ করে নদীটি প্রথমে ভারতে প্রবেশ করেছে, যা সেখানে কোদালিয়া নামে পরিচিত। পরবর্তীতে যশোরের শার্শা উপজেলার নাভারণ দিয়ে এটি পুনরায় বাংলাদেশে প্রবেশ করে সাতক্ষীরায় গিয়ে মরিচ্চাপ নদীর সাথে মিলিত হয়ে খোলপেটুয়া নাম ধারণ করেছে। এই নদীটিই সুন্দরবন অংশে অর্পণগাছিয়া এবং সবশেষে মালঞ্চ নদী নামে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পতিত হয়েছে।

নদ-নদীর পাশাপাশি যশোর জেলায় বেশ কিছু বিখ্যাত বাওড় ও বিল রয়েছে, যা এই অঞ্চলের মৎস্য চাষ এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্যের মূল আধার। এর মধ্যে মণিরামপুরের ঝাঁপা বাওড় অন্যতম, যেখানে স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে দেশের বৃহত্তম ভাসমান সেতু। এছাড়া শার্শার কন্যাদাহের আশ্চর্য বাওড়, বুকভরা বাওড় ও বাহাদুরপুর বাওড় জেলাজুড়ে বেশ পরিচিত। তবে যশোরের অভয়নগর ও মণিরামপুর সংলগ্ন অঞ্চলের সবচেয়ে বড় দুঃখ হলো ভবদহ বিল। জলবদ্ধতার কারণে এই অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষকে প্রতি বছর চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়, যার মূল কারণ এই এলাকার নদীগুলোর নাব্য সংকট।
নিচে যশোর জেলার প্রধান নদ-নদী, বিল ও বাওড়সমূহের একটি তালিকা দেওয়া হলো:
| ক্রমিক | জলাশয়ের নাম | ধরন (নদী/বিল/বাওড়) | জেলা ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চল |
| ১ | কপোতাক্ষ নদ | নদী | চৌগাছা, ঝিকরগাছা, মণিরামপুর, কেশবপুর |
| ২ | ভৈরব নদী/নদ | নদী | যশোর সদর, অভয়নগর, হৈবৎপুর, উপশহর |
| ৩ | বেতনা নদী | আন্তঃসীমান্ত নদী | শার্শা (নাভারণ), ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা |
| ৪ | চিত্রা নদী | নদী | বাঘারপাড়া (জহুরপুর, খাজুরা) |
| ৫ | হরিহর নদ | নদী | মণিরামপুর ও সংশ্লিষ্ট এলাকা |
| ৬ | মযুদখালী নদী | নদী | যশোর জেলার আঞ্চলিক নদী |
| ৭ | ঝাঁপা বাওড় | বাওড় | মণিরামপুর উপজেলা |
| ৮ | ভবদহ বিল | বিল (জলাবদ্ধতা অঞ্চল) | মণিরামপুর ও অভয়নগর উপজেলা |
| ৯ | কন্যাদাহের আশ্চর্য বাওড় | বাওড় | শার্শা উপজেলা |
| ১০ | কুটিবাড়ি বিল | বিল | মাটিপুকুর অঞ্চল |
| ১১ | পদ্ম বিল | বিল | চাকলা অঞ্চল |
| ১২ | কালিয়ানীর বিল / বাহাদুরপুর বাওড় | বিল/বাওড় | যশোর জেলা |
| ১৩ | বুকভরা বাওড় | বাওড় | যশোর জেলা |
যশোরের এই প্রাকৃতিক জলাশয় ও নদীগুলোকে বাঁচাতে হলে অভিন্ন সীমান্ত নদীগুলোর পানির হিস্যা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় নদীগুলোর অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং নিয়মিত ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। নদীগুলো বাঁচলেই কেবল এই অঞ্চলের কৃষি, বাণিজ্য ও পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে।
মন্তব্য