খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই জানুয়ারি ২০১৫, ১২:৪৫ পিএম
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এবং খুলনা বিভাগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অঞ্চল হলো যশোর। উপজেলার সংখ্যানুসারে এটি দেশের একটি “এ” শ্রেণীভুক্ত জেলা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা হিসেবে যশোর ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য গৌরবময় স্থান দখল করে আছে। ভৈরব নদের তীরে গড়ে ওঠা এবং দেশের বৃহত্তম ফুলের বাজার গদখালীর কল্যাণে ‘ফুলের রাজধানী’ হিসেবে খ্যাত এই প্রাচীন জনপদের নামকরণের ইতিহাস অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও বৈচিত্র্যময়। তবে এই নামের উৎপত্তি নিয়ে ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মধ্যে বেশ কিছু মতবিরোধ এবং ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ প্রচলিত রয়েছে।

যশোর নামের উৎপত্তি সংক্রান্ত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং প্রাচীন মতবাদটি গড়ে উঠেছে আরবি শব্দকে কেন্দ্র করে। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, আরবি শব্দ ‘জসর’ (Jasr) থেকে যশোর শব্দের উৎপত্তি। আরবিতে ‘জসর’ শব্দের অর্থ হলো সাঁকো বা সেতু। এককালে এই অঞ্চলের সর্বত্র নদীনালা, খাল-বিল ও হাওড়-বাওড়ে পরিপূর্ণ ছিল। ফলে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের জন্য নদী বা খালের ওপর বাঁশের সাঁকো তৈরি করতে হতো। লোকমুখে প্রচলিত আছে, চতুর্দশ শতকের প্রখ্যাত সুফি সাধক পীর খানজাহান আলী (র.) যখন এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আসেন, তখন তিনি ভৈরব নদী পার হওয়ার জন্য একটি বিশাল বাঁশের সাঁকো বা ‘জসর’ নির্মাণ করেছিলেন। সেই সাঁকো পার হয়েই তিনি মুড়লীতে এসে আস্তানা গাড়েন। ধারণা করা হয়, এই সাঁকো নির্মাণের ঘটনা এবং আরবি শব্দ ‘জসর’ থেকেই কালক্রমে ‘যশোর’ নামের উৎপত্তি হয়েছে। গবেষকদের অনুমান, এই অঞ্চলের ‘কসবা’ নামটিও খ্রিষ্টীয় ১৩৯৮ সালের দিকে পীর খানজাহান আলীরই দেওয়া। তবে ভিন্নমতাবলম্বীদের একাংশের দাবি, খানজাহান আলী আসার আগে থেকেই এই অঞ্চলে ‘যশোর’ নামের অস্তিত্ব ছিল।
অন্য একটি বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতকে বাংলার বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম প্রতাপশালী শাসক মহারাজ প্রতাপাদিত্যের পিতা বিক্রমাদিত্য এবং তাঁর সহযোগী বসন্ত রায়কে কেন্দ্র করে এই নামের নতুন মোড় ঘোরে। তৎকালীন বাংলার রাজধানী গৌড়ে যখন চরম রাজনৈতিক অরাজকতা ও সুলতানি শাসনের পতনাবস্থা চলছিল, তখন চতুর বিক্রমাদিত্য ও বসন্ত রায় সুলতানের রাজকোষের অপরিমিত ধনরত্ন অসংখ্য নৌকা বোঝাই করে গোপনে এই সুন্দরবন অঞ্চলের নদীনালা ঘেরা নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নিয়ে আসেন। গৌড়ের সেই বিপুল ধন-সম্পদ এখানে পৌঁছানোর পর ধীরে ধীরে এই বন-জঙ্গলে ঘেরা এলাকাটির শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে থাকে এবং চারদিকে এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে এখানে একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই নবপ্রতিষ্ঠিত রাজ্যের নামকরণ করা হয় ‘যশোহর’। সমকালীন প্রবাদ ও ঐতিহাসিক বিবরণী অনুযায়ী, প্রাচীন রাজধানী গৌড়ের সমস্ত ‘যশ’ (গৌরব ও ঐশ্বর্য) ‘হরণ’ করে বা কেড়ে নিয়ে এই নতুন অঞ্চলের সমৃদ্ধি ও শ্রী বৃদ্ধি পেয়েছিল বলেই এই রাজ্যের নাম রাখা হয়েছিল ‘যশোহর’ (যশ + হরণ)। অনেকের মতে, এই অঞ্চলের পূর্বের স্থানীয় নাম ‘যশোর’ হলেও মহারাজ প্রতাপাদিত্যের আমলে রাজকীয় প্রভাবে তা ‘যশোহর’ হিসেবে কাগজে-কলমে প্রতিষ্ঠিত হয়। ভাষা বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমানের বহুল ব্যবহৃত ‘যশোর’ শব্দটি আসলে সেই ঐতিহাসিক ‘যশোহর’ শব্দেরই একটি আধুনিক ও সহজপাঠ্য অপভ্রংশ বা বিবর্তিত রূপ।
সেতু বা সাঁকোর ‘জসর’ কিংবা গৌরব হরণের ‘যশোহর’—উৎস যেটাই হোক না কেন, যুগের পর যুগ ধরে এই নামটির সাথে জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের মানুষের বীরত্ব, আতিথেয়তা এবং অর্থনৈতিক স্বকীয়তার এক অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস।
মন্তব্য