খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ই জানুয়ারি ২০১৫, ২:২৩ পিএম
একটি অঞ্চলের শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের পেছনে সে দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, কৃষি উৎপাদন এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত সুপ্রাচীন গাঙ্গেয় বদ্বীপের খণ্ডিত অংশ যশোর জেলা। ভৌগোলিক দিক থেকে বঙ্গোপসাগর এ জেলা থেকে প্রায় ৭০-৭৫ মাইল দক্ষিণে এবং মোংলা (চালনা) সমুদ্রবন্দর যশোর সদর থেকে মাত্র ৫৫-৬০ মাইল দূরে অবস্থিত। বন্যাপ্রবণতা মুক্ত উঁচু ও শুষ্ক ভূমির এই জেলাটি একসময় নিছক কৃষিপ্রধান অঞ্চল থাকলেও, সময়ের সাথে সাথে এখানে বৃহৎ শিল্প ও অবকাঠামোগত প্রকল্পের বিকাশ ঘটছে।

Table of Contents
আজকের যশোর সড়ক, রেল এবং আকাশপথে (যশোর বিমানবন্দর) রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য প্রধান নগরী ও বন্দরের সাথে চমৎকারভাবে সংযুক্ত। নিচে এই জেলার কৃষি-অর্থনীতি, ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প এবং আধুনিক বৃহৎ শিল্প প্রকল্পের একটি নিবিড় চিত্র তুলে ধরা হলো:
ঐতিহাসিকভাবেই যশোরের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হলো কৃষি। এখানকার উর্বর মাটিতে প্রচুর পরিমাণে ধান, ইক্ষু (আখ), মরিচ, কলাই, মসুর, ছোলা, আদা, পান এবং তামাক উৎপাদিত হয়। তবে এই জেলাকে সারা দেশে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে এর ঐতিহ্যবাহী ‘খেজুর গুড় শিল্প’। ব্রিটিশ আমল থেকেই যশোর খেজুরের গুড় ও পাটালির জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত।
জেলার মোট শিল্প শ্রমিকের একটি বিরাট অংশ এখনো কুটির শিল্পের সাথে যুক্ত। ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৬২ সালের শেষভাগেও জেলায় কুটির শিল্পের সংখ্যা ছিল ২৯,৬৪৬টি এবং ক্ষুদ্র শিল্পের সংখ্যা ছিল ৫১৫টি; যেখানে যথাক্রমে ৮৮,৭৩০ জন এবং ৩,৪১৬ জন শ্রমিক নিয়োজিত ছিলেন। বর্তমান আধুনিক যুগেও এই কুটির শিল্পগুলোর ঐতিহ্য গ্রামীণ কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে।
১৯৬০ সাল পর্যন্ত যশোর জেলায় আধুনিক অর্থে কোনো বৃহৎ শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। তবে পরবর্তীকালে ভৈরব নদের তীরবর্তী অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া অঞ্চলটিকে কেন্দ্র করে এই জেলায় শিল্পায়নের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। নওয়াপাড়া আজ দেশের অন্যতম বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক নদী বন্দর ও শিল্প হাবে পরিণত হয়েছে।
যশোরের শিল্পায়নকে বেগবান করা প্রধান প্রধান বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো হলো:
যশোরের ভৌগোলিক সুবিধা, যোগাযোগ এবং শিল্পায়নের মূল উপাদানগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নিচে ছক আকারে দেওয়া হলো:
| ক্রমিক | খাতের বিবরণ | সংশ্লিষ্ট এলাকা/অবস্থান | অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও বর্তমান প্রেক্ষাপট |
| ১ | বৃহৎ পাট ও বস্ত্র শিল্প | নওয়াপাড়া, অভয়নগর | পাটজাত পণ্য উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি। |
| ২ | নদী বন্দর ও বাণিজ্য হাব | ভৈরব নদ তীরবর্তী অঞ্চল, নওয়াপাড়া | সার, কয়লা ও সিমেন্ট আমদানির দেশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। |
| ৩ | এভিয়েশন ও যোগাযোগ | যশোর বিমানবন্দর, সদর | ঢাকা-যশোর রুটে নিয়মিত বিমান চলাচলের মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা। |
| ৪ | আন্তর্জাতিক স্থল বাণিজ্য | বেনাপোল স্থলবন্দর, শার্শা | ভারতের সাথে দেশের সর্ববৃহৎ স্থল বাণিজ্য ও রাজস্ব আদায়ের উৎস। |
| ৫ | ঐতিহ্যবাহী গুড় শিল্প | জেলাজুড়ে (বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চল) | শত বছরের ঐতিহ্যবাহী খেজুর গুড় ও পাটালি উৎপাদন। |
| ৬ | বিশেষায়িত কৃষি (ফুল চাষ) | গদখালী, ঝিকরগাছা | দেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক ফুলের বাজার ও ফুলের রাজধানী। |
যদিও প্রাচীন নওয়াপাড়ার শিল্পগুলো যশোরের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ সরকারের বেশ কিছু মেগা প্রকল্প যশোর জেলাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রে রূপান্তর করেছে।

ঝাঁপা ভাসমান সেতু কিংবা গদখালীর নয়নাভিরাম ফুল বাগানের সৌন্দর্যে ঘেরা যশোর জেলাটি আজ আর কেবল কৃষির ওপর নির্ভরশীল নয়। নওয়াপাড়ার বৃহৎ শিল্পকারখানা, উন্নত বিমান ও রেল যোগাযোগ এবং মোংলা সমুদ্রবন্দরের নৈকট্য—সব মিলিয়ে যশোর জেলাটি এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হতে যাচ্ছে।
মন্তব্য