খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জানুয়ারি ২০১৫, ২:৮ পিএম
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক ঐতিহ্যবাহী এবং গৌরবময় জনপদ যশোর। ১৭৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জেলাটি কেবল বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল জেলাই নয়, বরং এটি দেশের প্রথম স্বাধীন জেলা হিসেবেও ইতিহাসে স্বীকৃত। শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি আর লোকজ ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ যশোর জেলা বেশ কিছু অনন্য কারণে দেশ ও বিদেশে সমাদৃত। আমাদের আজকের আলোচনায় আমরা জানবো—যশোর জেলা ঠিক কিসের জন্য বিখ্যাত।

Table of Contents
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক ঐতিহ্যবাহী এবং গৌরবময় জনপদ যশোর। ১৭৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জেলাটি কেবল বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল জেলাই নয়, বরং এটি দেশের প্রথম স্বাধীন জেলা হিসেবেও ইতিহাসে স্বীকৃত। শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি আর লোকজ ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ যশোর জেলা বেশ কিছু অনন্য কারণে দেশ ও বিদেশে সমাদৃত। আমাদের আজকের আলোচনায় আমরা জানবো—যশোর জেলা ঠিক কিসের জন্য বিখ্যাত।
যশোরের নামের সাথে সবচেয়ে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এর বিখ্যাত খেজুর গুড় ও পাটালির ঐতিহ্য। “যশোরের যশ, খেজুরের রস”—এই প্রবাদটি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।
প্রস্তুত প্রণালি ও প্রকারভেদ: বাংলা অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত গাছিরা খেজুর গাছ থেকে মিষ্টি রস সংগ্রহ করেন। এই রসকে বড় তাপালে (লোহার পাত্রে) জ্বাল দিয়ে ঘন করে তৈরি করা হয় সুস্বাদু গুড়। ধরন অনুযায়ী একে ঝোলা গুড়, দানা গুড়, এবং শক্ত পাটালি গুড়ে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে সুবাসিত ও প্রিমিয়াম কোয়ালিটি হলো ‘নলেন গুড়’।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও সংকট: এই গুড় গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে। শীতকালে এই গুড় দিয়ে তৈরি হয় হরেক রকমের পিঠা, পায়েস এবং ঐতিহ্যবাহী খেজুর গুড়ের জিলাপি। তবে বর্তমানে দক্ষ গাছির অভাব এবং ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে নির্বিচারে খেজুর গাছ কাটার ফলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি এখন হুমকির মুখে।
যশোরের বিখ্যাত খাবারের তালিকায় অন্যতম শীর্ষস্থান দখল করে আছে জামতলার মিষ্টি, যা স্থানীয়ভাবে ‘সাদেক গোল্লা’ নামে সুপরিচিত। এটি মূলত রসগোল্লারই একটি বিশেষ রূপ।
ইতিহাস: এই মিষ্টির ইতিহাস প্রায় সাত দশকের পুরোনো। ১৯৫৫ সালে যশোর-সাতক্ষীরা মহাসড়কের পাশে শার্শা উপজেলার জামতলা বাজারে শেখ সাদেক আলী নামের এক চায়ের দোকানদার প্রথম এই মিষ্টি তৈরি করেন। একদিন এক ঘোষের কাছ থেকে অতিরিক্ত দুধ রেখে দেওয়ার পর, কুমিল্লার এক অভিজ্ঞ মিষ্টি কারিগরের পরামর্শ ও সহযোগিতায় সাদেক আলী এই বিশেষ গোল্লা তৈরি করেন।
বৈশিষ্ট্য: দেশি গরুর খাঁটি ছানা এবং সামান্য চিনির হালকা রসে ডুবানো এই মিষ্টি দেখতে কিছুটা লালচে বা বাদামি রঙের হয়। এর স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো এবং এতে কোনো কৃত্রিম সুগন্ধি ব্যবহার করা হয় না।
যশোরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রাণ বলা চলে কপোতাক্ষ নদকে। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত এই নদ যশোরকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করেছে। কবি তাঁর বিখ্যাত ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতায় এই নদের বন্দনা করেছেন।
ভৌগোলিক তথ্য: নদীটি ভৈরব নদ থেকে উৎপন্ন হয়ে চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর, সাতক্ষীরা ও খুলনার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে খোলপেটুয়া নদীতে পতিত হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃক কপোতাক্ষ নদের প্রদত্ত বর্তমান পরিচিতি নম্বর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ০৪। যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা ও কেশবপুর উপজেলার ওপর দিয়ে এটি প্রবাহিত হয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী খই: গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম অংশ হলো ধানের তৈরি খই (Puffed Rice)। যশোরের বিভিন্ন অঞ্চলের বিশেষ কিছু আমন ধান থেকে তৈরি মুড়মুড়ে খই এবং খেজুর গুড়ের উখড়া বা মোয়া অত্যন্ত জনপ্রিয়।
ফুলের রাজধানী ‘গাদখালি’: যশোর জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত—এই প্রশ্নের উত্তর বর্তমান সময়ে ‘গাদখালি’ ছাড়া অসম্পূর্ণ। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গাদখালিকে বলা হয় বাংলাদেশের “ফুলের রাজধানী”। দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৭০-৮০ ভাগ ফুল এই গাদখালি ও তার আশেপাশের মাঠ থেকে সরবরাহ করা হয়। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে গোলাপ, জারবেরা, গ্ল্যাডিওলাস এবং রজনীগন্ধার চাষ যশোরের অর্থনীতি ও পর্যটনকে সমৃদ্ধ করেছে।
যশোরের রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ব্যাকগ্রাউন্ড, যার প্রমাণ মেলে এখানকার স্থাপত্যগুলোতে:
যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি: এটি ভারত উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং সর্ববৃহৎ পাবলিক লাইব্রেরি, যা ১৮৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।
তালখড়ি জমিদার বাড়ি: জেলার মণিরামপুর উপজেলায় অবস্থিত এই প্রাচীন জমিদার বাড়িটি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
অন্যান্য আকর্ষণ: এ ছাড়া কেশবপুরের মির্জানগর হাম্মামখানা, কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি (সাগরদাঁড়ি), এবং দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর ‘বেনাপোল’ এই যশোর জেলাতেই অবস্থিত।

খাবারের স্বাদ, প্রকৃতির রূপ আর ইতিহাসের গৌরব—সব মিলিয়ে যশোর বাংলাদেশের মানচিত্রে এক অনন্য জেলা। আপনি যদি খাঁটি নলেন গুড়ের স্বাদ নিতে চান কিংবা ফুলের মহাসমুদ্রে হারিয়ে যেতে চান, তবে যশোর আপনার জন্য সেরা গন্তব্য।
মন্তব্য