খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জানুয়ারি ২০১৫, ২:৩৪ পিএম
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানচিত্রে যশোর এক অনন্য নাম। খুলনা বিভাগের এই জেলাটি কেবল ঐতিহ্যের ধারকই নয়, ভৌগোলিক কৌশলগত অবস্থানের দিক থেকেও এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। প্রখ্যাত লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাসের পাতায় কিংবা মাইকেল মধুসূদন দত্তের কপোতাক্ষ নদের কাব্যে যে যশোরের ছবি ফুটে ওঠে, তার মূল ভিত্তিই হলো এই ভূখণ্ডের অনন্য ভৌগোলিক বিন্যাস।

Table of Contents
ভূ-তাত্ত্বিক দিক থেকে যশোরকে একটি ‘মৃতপ্রায় ব-দ্বীপ’ বা মরিবান্ড ডেল্টা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এটি মূলত গঙ্গা, পদ্মা এবং হুগলি নদীর মধ্যবর্তী বিশাল ব-দ্বীপীয় সমভূমির একটি অংশ। আপনি যদি গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মধ্যবর্তী অঞ্চলটিকে উত্তর থেকে দক্ষিণে তিনটি সমান ভাগে ভাগ করেন, তবে তার মধ্যভাগের পশ্চিম-উত্তর এবং দক্ষিণ-পূর্ব অংশটুকু বাদ দিয়ে বাকি পুরো অঞ্চলটিই হলো ঐতিহাসিক যশোর। পলিমাটির ক্রমাগত সঞ্চয়ে গঠিত এই ভূমি ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত উর্বর। এটি এমন এক ভূমি, যা একসময় সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে ঢাকা ছিল। কালক্রমে মানুষের বসতি গড়ে ওঠায় এবং ভূমিরূপের পরিবর্তনে এখানকার সেই নিবিড় অরণ্য আজ বিলীন হয়ে গেছে, তবে রয়ে গেছে উর্বর পলল ভূমির সমৃদ্ধি।
যশোর জেলার ভৌগোলিক অবস্থান ৮৮°৪০’ থেকে ৮৯°৫০’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এবং ২২°৪৭’ থেকে ২৩°৪৭’ উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে। তবে যশোরের মানচিত্র কেবল স্থির থাকেনি, বরং সময়ের সাথে এর আয়তন ও সীমানায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন:
অবিভক্ত যশোর: ব্রিটিশ শাসনামলে যশোরের ব্যাপ্তি ছিল বিশাল। তখন এর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৪৪ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৭৬.৮ কিলোমিটার। এমনকি সুন্দরবনের ৪,৪৬১.৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাও ছিল এই জেলার অংশ। তখন আদি যশোরের মোট আয়তন ছিল প্রায় ১৪,৫৬০ বর্গকিলোমিটার।
বিবর্তন ও সংকোচনের ইতিহাস: দেশভাগের পর বিভিন্ন মহকুমা বিভাজনের ফলে যশোরের আয়তন কমে আসে। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসে ১৯৮৪ সালে—যখন মাগুরা, ঝিনাইদহ এবং নড়াইল পৃথক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ফলে যশোরের আয়তন বর্তমান পর্যায়ে এসে স্থিতিশীল হয়েছে।
যশোরের ভূ-প্রকৃতি তুলনামূলক উঁচু ও শুষ্ক প্রকৃতির। এটি ব-দ্বীপীয় অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও উচ্চতার কারণে সচরাচর সাধারণ বন্যায় প্লাবিত হয় না, যা একে অন্যান্য নিচু অঞ্চলের জেলাগুলো থেকে কিছুটা আলাদা করে রাখে। নিচে জেলার প্রধান ভৌগোলিক উপাদানগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| ভৌগোলিক উপাদান | প্রধান বৈশিষ্ট্য |
| অবস্থান | ৮৮°৪০’ – ৮৯°৫০’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ; ২২°৪৭’ – ২৩°৪৭’ উত্তর অক্ষাংশ |
| ভূমির প্রকৃতি | উঁচু ও শুষ্ক পলল সমভূমি, মৃতপ্রায় ব-দ্বীপ |
| প্রধান নদ-নদী | ভৈরব, কপোতাক্ষ, চিত্রা, হরিহর, বেত্রাবতী ও ইছামতি |
| প্রাচীন ঐতিহ্য | অতীতে সুন্দরবনের বড় অংশ অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বর্তমানে বনভূমি নেই |
যশোরের নামকরণের পেছনে দুটি চমৎকার লোকগাথা ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমটি ভাষাতাত্ত্বিক—আরবি ‘জসর’ শব্দ থেকে ‘যশোর’ শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ সাঁকো বা সেতু। নদী ও খালে পরিপূর্ণ এই অঞ্চলে একসময় যাতায়াতের জন্য বাঁশের সাঁকোর ব্যাপক ব্যবহার ছিল। শোনা যায়, ১৩৯৮ সালের দিকে সুফি সাধক পীর খানজাহান আলী (র.) যখন ভৈরব নদী পার হয়ে মুড়লীতে এসেছিলেন, তখন তিনি বিশাল এক বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করেছিলেন। সেই থেকে অঞ্চলটির নাম হয় যশোর।
দ্বিতীয়টি ঐতিহাসিক কিংবদন্তি—ষোড়শ শতকে গৌড়ের সুলতানি শাসনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে মহারাজ প্রতাপাদিত্যের পিতা বিক্রমাদিত্য ও বসন্ত রায় সুলতানের রাজকোষের অঢেল ধনরত্ন নিয়ে গোপনে সুন্দরবনের গহীনে এই নদীমাতৃক অঞ্চলে আশ্রয় নেন। প্রচলিত আছে, প্রাচীন রাজধানী গৌড়ের সমস্ত ‘যশ’ বা গৌরব হরণ করে এই অঞ্চলে নতুন সমৃদ্ধি এসেছিল বলেই একে ‘যশোহর’ (যশ + হরণ) নাম দেওয়া হয়েছিল। আধুনিক ‘যশোর’ শব্দটি মূলত সেই ‘যশোহর’-এরই একটি সংক্ষিপ্ত ও পরিমার্জিত রূপ।

আজকের যশোরে গভীর সুন্দরবন নেই সত্য, কিন্তু রয়েছে ভৈরব ও কপোতাক্ষের শান্ত জলরাশি এবং ঝাঁপা বাওড়ের মতো মনোরম জলাশয়। ভৌগোলিকভাবে এটি এখন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি প্রধান বাণিজ্যিক ও যোগাযোগ হাব। বেনাপোল স্থলবন্দরের নৈকট্য এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এই জেলাটি আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির এক অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইতিহাসের পাতায় থাকা সেই ‘মৃতপ্রায় ব-দ্বীপ’ আজ আধুনিকতার ছোঁয়ায় নবপ্রাণ ফিরে পেয়েছে, যেখানে নদী আর সমতলের মিলনমেলায় গড়ে উঠেছে এক উন্নত জীবনধারা।
মন্তব্য