খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জানুয়ারি ২০১৫, ১:৫ পিএম
বাঙালির আতিথেয়তা, উৎসব-পার্বণ কিংবা যেকোনো শুভ সংবাদে মিষ্টিমুখ করানোর রীতি শত বছরের পুরনো। প্রাচীনকালে যেখানে ‘গুড়জল’ কিংবা আখ, খেজুর ও তালের গুড়-মিছরি দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করা হতো, মধ্যযুগে ছানার আবিষ্কার সেই মিষ্টির জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। তবে ছানার মিষ্টির পাশাপাশি বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে মিশে থাকা ক্ষীর ও পায়েস আজও যশোর অঞ্চলে স্বনামে ও সুনামে টিকে আছে।

Table of Contents
যশোর জেলার রন্ধনশিল্পের ইতিহাস শুধু মিষ্টিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এখানকার বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী ঝাল খাবারও সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের (যেমন: কুলখানি, মুখেভাত, খতনা, গায়েহলুদ, বিয়ে, ঈদ ও মহররম) আপ্যায়নে অতুলনীয় স্থান দখল করে আছে। নিচে যশোরের সেই হারিয়ে যাওয়া এবং এখনো জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
গ্রামের বধূরা আজও পরম যত্নে প্রাচীন এই মিষ্টি খাবারগুলোর ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন:
অতিথি আপ্যায়ন ও উৎসবের টেবিলকে সমৃদ্ধ করতে যশোরের অনন্য কিছু ঝাল পদের রান্নার ইতিহাস রয়েছে:
যশোরের ভোজনরসিকদের কাছে অন্যতম প্রিয় একটি খাবারের নাম ঘাটকোল, যা মূলত ‘ঘেঁটকচু’ নামে পরিচিত। বিশেষ করে গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতুতে এই ঘাটকোলের কদর বহুগুণ বেড়ে যায়। অনেকে মাছ-মাংসের চেয়ে ঘাটকোলের তরকারি দিয়েই তৃপ্তি সহকারে ভূরিভোজ করতে পছন্দ করেন।
ভেষজ গুণাগুণ: আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য তাঁর বিখ্যাত ‘চিরঞ্জীব বনৌষধি’ গ্রন্থে ঘাটকোল সম্পর্কে লিখেছেন—এটি অতিশয় উত্তেজক, উদরশূল (পেটের ব্যথা) নাশক, রক্তস্রাব নিবারক ও বিরোচক। এছাড়া এটি খেলে পেট ও পায়খানা পরিষ্কার হয়। প্রাচীন লোক-চিকিৎসায় বিষাক্ত সাপের কামড়ে, কিংবা মৌমাছি, বোলতা, ভিমরুল ও বিছা কামড়ালে যন্ত্রণা উপশমে এর মূল বেটে প্রলেপ দেওয়ার প্রচলন আছে। সাধারণত এর ডাঁটা খাওয়া হলেও পাতা বেটেও অনেকে খেয়ে থাকেন।
যশোর অঞ্চলে ঘাটকোল রান্নার দুটি সেরা ও উপাদেয় রেসিপি নিচে দেওয়া হলো:
প্রস্তুত প্রণালী: এক আঁটি ঘাটকোল এক ইঞ্চি আকারে টুকরো করে কেটে নিতে হবে এবং এর সাথে কয়েকটি কাঁঠালের বিচিও কেটে নিতে হবে। এরপর ঘাটকোল ও কাঁঠালের বিচি একসাথে ভালো করে সেদ্ধ করে জল ঝরিয়ে নিতে হবে। এবার কড়াইতে তেল গরম করে পরিমাণমতো হলুদ, লবণ, মরিচ, পেঁয়াজ এবং আদা-রসুন বাটা দিয়ে সেদ্ধ করা উপাদানগুলো খুব ভালো করে কষিয়ে নিতে হবে। এই মাখামাখা কষা ব্যঞ্জনটি গরম ভাতের সাথে অত্যন্ত উপাদেয়।
প্রস্তুত প্রণালী: প্রথমে এক আঁটি ঘাটকোল ছোট ছোট টুকরো করে কেটে পানিতে সেদ্ধ করে নিতে হবে। এরপর কড়াইতে পরিমাণমতো তেল দিয়ে তাতে হলুদ, লবণ, আদা বাটা, রসুন বাটা ও শুকনা মরিচ বাটা দিয়ে মসলা কষাতে হবে। মসলা কষানো হলে সেদ্ধ করা ঘাটকোলগুলো তাতে ছেড়ে দিয়ে ভালো করে নাড়তে হবে। কষানো শেষে ওপর থেকে এক বাটি ঘন নারিকেলের দুধ ঢেলে দিতে হবে। নারিকেলের দুধ শুকিয়ে যখন তরকারির ওপর তেল ভেসে উঠবে, তখন নামিয়ে গরম গরম ভাতের সাথে পরিবেশন করতে হবে।

ঝাঁপা ভাসমান সেতুর শান্ত জলরাশি কিংবা তালখড়ি জমিদার বাড়ির ইতিহাসের মতোই যশোরের এই রান্নার ঐতিহ্যগুলো অনন্য। ঘাটকোলের মতো সাধারণ ভেষজ উদ্ভিদকে নারিকেল দুধ বা কাঁঠালের বিচি দিয়ে অসাধারণ ব্যঞ্জনে রূপ দেওয়ার এই রন্ধনশৈলীই যশোর জেলাকে বাংলাদেশের খাদ্য সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ ও স্বতন্ত্র মর্যাদায় ভূষিত করেছে।
মন্তব্য