খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই জানুয়ারি ২০১৫, ১২:৫৩ পিএম
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এবং দেশের প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা যশোরের অর্থনীতি অত্যন্ত সুদৃঢ় এবং বৈচিত্র্যময়। উপজেলার সংখ্যানুসারে একটি ‘এ’ শ্রেণীভুক্ত জেলা হিসেবে এর প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব অপরিসীম। ভৈরব নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই জেলার ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভারতের সাথে সীমান্ত সংযোগ এখানকার মানুষের পেশাগত জীবনে এক বিশাল বৈচিত্র্য এনে দিয়েছে। প্রথাগত কৃষিকাজের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আধুনিক মৎস্য চাষ এবং বিশেষায়িত ফুল চাষকে কেন্দ্র করে এই জেলার লাখ লাখ মানুষ তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন।

যশোরের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি এবং মানুষের প্রধান প্রধান পেশাগুলোর বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
Table of Contents
যশোরকে অবলীলায় বাংলাদেশের ‘ফুলের রাজধানী’ বলা হয়। জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী এবং এর আশেপাশের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে দেশের সিংহভাগ বাণিজ্যিক ফুলের চাষ হয়। এখানকার হাজার হাজার কৃষকের প্রধান এবং একমাত্র পেশা হলো ফুল চাষ। গোলাপ, রজনীগন্ধা, গ্ল্যাডিওলাস, জারবেরা ও গাঁদা ফুলের মতো মূল্যবান ফুল উৎপাদন করে এখানকার চাষিরা জীবিকা নির্বাহ করেন। শুধু ফুল চাষই নয়, এই ফুল তোলা, বাঁধাই করা, চটের প্যাকেটে ভরা এবং তা গদখালী পাইকারি বাজারে এনে বিক্রি করার সাথে বিশাল এক শ্রমিক ও ব্যবসায়ী শ্রেণী জড়িত। প্রতিদিন ভোরে বসা এই ফুলের হাটকে কেন্দ্র করে পরিবহন ও বিপণন খাতে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক ফুল চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে।
যশোরের গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ামক হলো মৎস্য চাষ। বিশেষ করে অভয়নগর, মণিরামপুর ও সদর উপজেলার একটি বিশাল অংশের মানুষের প্রধান পেশা ঘের বা পুকুরে মাছ চাষ। এখানকার অর্থনীতিতে চিংড়ি চাষের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গলদা ও বাগদা চিংড়ি চাষ এবং তা প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিদেশে রফতানি করে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। চিংড়ি ছাড়াও এখানে রুই, কাতলা ও বিভিন্ন কার্প জাতীয় সাদা মাছের নিবিড় চাষ হয়। রেণু পোনা উৎপাদন থেকে শুরু করে মাছের খাদ্য তৈরি, পরিবহন এবং আড়তদারির সাথে এ জেলার এক বিশাল জনগোষ্ঠী ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
শার্শা উপজেলার সীমান্তবর্তী বেনাপোল পৌরশহরে অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ এবং প্রধান স্থলবন্দর ‘বেনাপোল’। ভারতের পেট্রাপোলের সাথে সংযুক্ত এই বন্দরের মাধ্যমে দুই দেশের সিংহভাগ স্থল বাণিজ্য সম্পন্ন হয়। এই আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক হাবটি গোটা যশোর জেলার মানুষের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম প্রধান উৎস। এখানকার একটি বিরাট অংশের মানুষের পেশা হলো কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং (C&F) এজেন্টের কাজ। এছাড়া আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা, কাস্টমস ব্রোকারেজ, বন্দর হ্যান্ডলিং বা লেবার, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের পরিবহন ব্যবসা এবং সীমান্তকেন্দ্রিক হোটেল-রেস্তোরাঁ পরিচালনার মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের একটি বড় অংশ তাদের স্থায়ী কর্মসংস্থান খুঁজে নিয়েছে। সরকারি রাজস্ব আহরণে অনন্য ভূমিকা রাখা এই বন্দরটি এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে।
যশোরের ব্যবসা-বাণিজ্যের আসল প্রাণকেন্দ্র বলা যায় অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়াকে। ভৈরব নদের তীরে অবস্থিত এই নদী বন্দরটি দেশের অন্যতম বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য কেন্দ্র। অভ্যন্তরীণ নৌপথে কয়লা, সার, সিমেন্ট ও খাদ্যশস্য আমদানি-রপ্তানির এক বিশাল হাব এটি। এখানকার উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টায় নওয়াপাড়ার আশেপাশে অসংখ্য জুট মিল, টেক্সটাইল, ডকইয়ার্ড এবং উৎপাদনমুখী শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। ফলে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের প্রধান পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে শিল্প শ্রমিক, নৌপরিবহন কর্মী, লোড-আনলোড লেবার এবং ভারী ম্যাসিনারি পরিচালনা। এছাড়া মধ্যম ও বৃহৎ পাইকারি ব্যবসার সাথেও এখানকার বহু মানুষ যুক্ত আছেন।

যশোর জেলার সামগ্রিক কর্মসংস্থান ও পেশাগত বৈচিত্র্যের একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:
| ক্রমিক | পেশার ক্ষেত্র | সংশ্লিষ্ট প্রধান অঞ্চলসমূহ | অর্থনীতির ওপর প্রভাব ও গুরুত্ব |
| ১ | ফুল চাষ ও বিপণন | ঝিকরগাছা (গদখালী), শার্শা | দেশের সর্ববৃহৎ ফুলের জোগান নিশ্চিত করে। |
| ২ | চিংড়ি ও মৎস্য চাষ | মণিরামপুর, অভয়নগর, সদর | রফতানি বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল উৎস। |
| ৩ | সিঅ্যান্ডএফ ও বন্দর শ্রমিক | বেনাপোল, শার্শা | ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম। |
| ৪ | শিল্প ও নৌ-বাণিজ্য | নওয়াপাড়া, অভয়নগর | কয়লা, সার ও ভারী পণ্যের দেশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার। |
| ৫ | প্রথাগত কৃষি (ধান ও সবজি) | চৌগাছা, বাঘারপাড়া, সদর | উদ্বৃত্ত সবজি উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ। |
ঐতিহ্যবাহী চাষাবাদের গণ্ডি পেরিয়ে আধুনিক বাণিজ্য ও কুটির শিল্পের প্রসারের কারণে যশোরের মানুষের জীবনযাত্রার মান এবং মাথাপিছু আয় দেশের অন্যান্য অনেক অঞ্চলের চেয়ে বেশ উন্নত। এই অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাই যশোরকে একটি সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।
মন্তব্য