বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক গৌরবময় এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অঞ্চল হলো যশোর। দেশের প্রথম স্বাধীন ও শত্রুমুক্ত এই জেলাটি শুধু মুক্তিযুদ্ধে অনন্য ভূমিকার জন্যই নয়, বরং এর বিশাল ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রাচীন নাগরিক সুযোগ-সুবিধার জন্যও সুপরিচিত। ভৈরব নদের তীরে গড়ে ওঠা এবং বর্তমানের ‘ফুলের রাজধানী’ খ্যাত এই প্রাচীন জনপদটির ভৌগোলিক আয়তন, সীমানা এবং এর ঐতিহাসিক বিকাশের ধারা নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
যশোর জেলার আয়তন ও ভৌগোলিক সীমানা
ভৌগোলিক দিক থেকে যশোর জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে অবস্থান করছে।
- মোট আয়তন: যশোর জেলার সর্বমোট ভৌগোলিক আয়তন ২,৬০৬.৯৪ বর্গকিলোমিটার (যা মাইলের হিসাবে প্রায় ১,০০৬.৫৫ বর্গমাইল)।
- চতুঃসীমা: এই জেলার ভৌগোলিক চারপাশের বিন্যাস অত্যন্ত চমৎকার। যশোরের উত্তরে রয়েছে ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলা; দক্ষিণে সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলা; পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত নড়াইল ও খুলনা জেলা এবং এর ঠিক পশ্চিম সীমান্তজুড়ে রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। ভারতের সাথে দেশের প্রধান বাণিজ্যিক স্থলবন্দর বেনাপোল এই জেলার পশ্চিম সীমান্তেই অবস্থিত।
প্রাচীন ইতিহাস ও প্রশাসনিক বিবর্তনের পরিক্রমা
হাজার বছরের প্রাচীন এই জনপদটির শাসনতান্ত্রিক ও নাগরিক কাঠামোর বিবর্তন অত্যন্ত সুদীর্ঘ। নিচে এর প্রধান ঐতিহাসিক মাইলফলকগুলো আলোচনা করা হলো:
- আউলিয়াদের আগমন ও রাজ্য প্রতিষ্ঠা: আনুমানিক ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে প্রখ্যাত সুফি সাধক পীর খান জাহান আলী (র.) তাঁর সঙ্গী বারোজন আউলিয়াকে সাথে নিয়ে যশোরের ‘মুড়লী’ নামক স্থানে আসেন এবং ইসলাম ধর্ম প্রচারের প্রধান কেন্দ্র স্থাপন করেন। তাঁর হাত ধরেই এখানে ‘মুড়লী কসবা’ নামের একটি প্রাচীন শহরের পত্তন ঘটে। পরবর্তীতে ১৫৫৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে রাজা বিক্রমাদিত্য ও প্রতাপাদিত্যের আমলে স্বাধীন ‘যশোর রাজ্য’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় বর্তমান খুলনা, ভারতের বনগাঁ এবং কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরের অংশবিশেষ এই বিশাল যশোর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
- জমিদারি আমল ও জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ: ১৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দের দিকে এই অঞ্চলটি নাটোরের বিখ্যাত রানী ভবানীর জমিদারির অধীনে আসে। পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসনামলে, ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে যশোর একটি পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
- নাগরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ: যশোর জেলার আধুনিকায়নের ইতিহাসও বেশ পুরনো। ১৮৬৪ সালে এখানে ‘যশোর পৌরসভা’ গঠিত হয়, যা দেশের অন্যতম প্রাচীন পৌরসভা। শিক্ষাদীক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ঐতিহাসিক ‘যশোর জিলা স্কুল’ এবং ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে ‘যশোর পাবলিক লাইব্রেরি’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেই কলকাতার সাথে যশোরের সরাসরি রেলযোগাযোগ এবং বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় ও চতুর্থ দশকের মাঝামাঝি সময়ে এখানে যশোর বিমানবন্দর স্থাপিত হয়।
ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থানসমূহ
যশোরের এই বিশাল আয়তনের ভেতরে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান এবং প্রাচীন ইতিহাস। কন্টেন্টের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে নিচের ছবিগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে:
- যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি: ১৮৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই লাইব্রেরিটি ভারত উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং বৃহত্তম পাবলিক লাইব্রেরি, যা এই অঞ্চলের শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক অনন্য বাতিঘর।
- ঝাঁপা ভাসমান সেতু: মণিরামপুর উপজেলার ঝাঁপা ইউনিয়নে অবস্থিত প্লাস্টিকের ড্রাম দিয়ে তৈরি দেশের বৃহত্তম ভাসমান সেতুটি আধুনিক গ্রামীণ প্রকৌশল ও পর্যটনের এক চমৎকার আকর্ষণ।
২,৬০৬.৯৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিশাল যশোর জেলাটি ঐতিহ্যবাহী খেজুর গুড়, গদখালীর ফুল চাষ এবং প্রাচীন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণে বাংলাদেশের মানচিত্রে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। ঐতিহাসিক এই জনপদটি প্রাচীনকাল থেকেই তার ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বজায় রেখে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে এক অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
মন্তব্য