খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ই জানুয়ারি ২০১৫, ২:৩০ পিএম
যশোর কেবল বাংলাদেশের একটি সুপ্রাচীন জনপদই নয়, এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আনুমানিক ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সুফি সাধক পীর খানজাহান আলীসহ বারো জন আউলিয়া যশোরের মুড়লীতে এসে ইসলাম ধর্ম প্রচারের প্রধান কেন্দ্র স্থাপন করেন, যা কালক্রমে ‘মুড়লী কসবা’ নামে একটি বাণিজ্যিক শহরে রূপ নেয়। পরবর্তীতে ১৫৫৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে স্বাধীন যশোর রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, যার সীমানা বর্তমান খুলনা, বনগাঁ, কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরের অংশবিশেষ জুড়ে বিস্তৃত ছিল। ১৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দের দিকে এই অঞ্চল নাটোরের রানী ভবানীর জমিদারির অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ব্রিটিশ আমলে ১৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে যশোর একটি পৃথক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৮৬৪ সালে গঠিত হয় দেশের অন্যতম প্রাচীন যশোর পৌরসভা।

Table of Contents
ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে যশোর জিলা স্কুল, ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে যশোর পাবলিক লাইব্রেরি (বর্তমান যশোর ইনস্টিটিউট), ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে কলকাতার সাথে সরাসরি রেল-যোগাযোগ এবং বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় ও চতুর্থ দশকে যশোর বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠিত হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার এই সুপ্রাচীন অবকাঠামোই মূলত যশোরকে একটি আধুনিক বাণিজ্য হাব হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা হওয়ার গৌরব অর্জনকারী এই জেলাটির ব্যবসা-বাণিজ্য মূলত চারটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
যশোরের সামগ্রিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো শার্শা উপজেলার সীমান্তবর্তী বেনাপোল পৌরশহরে অবস্থিত দেশের প্রধান এবং সর্ববৃহৎ ‘বেনাপোল স্থলবন্দর’। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পেট্রাপোল সীমান্তের সাথে সংযুক্ত এই বন্দরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার স্থল বাণিজ্যের সিংহভাগ সম্পন্ন হয়ে থাকে।
অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া অঞ্চলটিকে অনায়াসে যশোরের ব্যবসা-বাণিজ্যের হূৎপিণ্ড বলা যায়। ভৈরব নদের অববাহিকায় অবস্থিত এই নদী বন্দরটি দেশের অন্যতম বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
যশোরের গ্রামীণ অর্থনীতিকে সবচেয়ে বেশি বেগবান করেছে নিবিড় মৎস্য চাষ। বর্তমান সময়ে যশোরের অর্থনীতির একটি বড় অংশ আসে মাছ চাষ, বিশেষ করে সাদা মাছের রেণু পোনা উৎপাদন এবং চিংড়ি রপ্তানি থেকে।
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী অঞ্চলটিকে দেশের ‘ফুলের রাজধানী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এটি বাংলাদেশের ফুল ব্যবসার মূল উৎসভূমি।
যশোরের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কাঠামোর একটি সারসংক্ষেপ নিচে ছক আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | বাণিজ্যিক খাতের নাম | প্রধান ভৌগোলিক অঞ্চল | অর্থনৈতিক প্রভাব ও অবদান |
| ১ | আন্তর্জাতিক স্থল বাণিজ্য | বেনাপোল, শার্শা | ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম এবং সরকারের অন্যতম সর্বোচ্চ শুল্ক আদায়ের উৎস। |
| ২ | অভ্যন্তরীণ নৌ-বাণিজ্য ও ভারী শিল্প | নওয়াপাড়া, অভয়নগর | কয়লা, সার ও খাদ্যশস্যের দেশীয় পাইকারি বাজার এবং জুট-টেক্সটাইল মিলের হাব। |
| ৩ | রফতানিমুখী মৎস্য শিল্প | মণিরামপুর, অভয়নগর, সদর | চিংড়ি ও সাদা মাছ রফতানির মাধ্যমে বিশাল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান। |
| ৪ | ফ্লোরিকালচার বা ফুল ব্যবসা | গদখালী, ঝিকরগাছা | সারা দেশের ফুলের চাহিদার সিংহভাগ জোগান দিয়ে জেলাকে ‘ফুলের রাজধানী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা। |
তালখড়ি জমিদার বাড়ির ঐতিহাসিক ঐতিহ্য কিংবা যশোর ইনস্টিটিউটের সাংস্কৃতিক জাগরণের মতোই সমৃদ্ধ এই জেলার বাণিজ্যিক ইতিহাস। ভৌগোলিক ও কৌশলগত সুবিধার কারণে বেনাপোলের কাস্টমস ব্যবসা, নওয়াপাড়ার নদী বন্দর, গদখালীর চোখ জুড়ানো ফুলের মাঠ এবং প্রমত্তা ঘেরের চিংড়ি চাষ—এই চার শক্তির ওপর ভর করেই যশোর জেলা আজ বাংলাদেশের অন্যতম স্বাবলম্বী ও প্রধান বাণিজ্যিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
মন্তব্য