আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় যশোর জেলার বিখ্যাত খাবার।
যশোর জেলার বিখ্যাত খাবার:-
বাঙালির সব পালা-পার্বণ, সামাজিক অনুষ্ঠান, শুভ কাজ বা সংবাদ, জয়, কৃতিত্ব, পরীক্ষার ফল, চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর মধ্যে হাতে তৈরি মিষ্টান্ন উপহার দেওয়ার রীতি অনেক আগে থেকেই। শত বছর ধরে বাঙালি এই প্রথা মেনে আসছে। প্রাচীনকালে ‘গুড়জল’ দিয়ে অতিথিকে মিষ্টিমুখ করানো হতো। সে সময় ধান ও আখ চাষের ওপর মিষ্টি নির্ভরশীল ছিল।
আখ, খেজুর, তালের গুড়-মিছরিই ছিল মিষ্টি। মধ্যযুগে ছানা আবিষ্কৃত হলে মিষ্টি তৈরিতে বিপ্লব সংঘটিত হয়। টকের সাহায্যে দুধকে ভেঙে ছানা তৈরি করে সেই ছানা দিয়ে বিভিন্ন মিষ্টি তৈরি শুরু হয়। কিন্তু বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত ক্ষীর, পায়েস আজও স্বনামে-সুনামে মাথা তুলে আছে।
যশোর অঞ্চলে ‘আল্লা আল্লা’, হ্যালা, সরুই পিঠা, রসের ক্ষীর, দুধকদু—এসব ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি খাবার। গ্রামের বধূরা হারিয়ে যাওয়া এই খাবারগুলো আগলে রেখেছে। মিষ্টি খাবারের পাশাপাশি আঞ্চলিক কয়েক রকম ঝাল খাবারও ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। অতিথি আপ্যায়ন, কুলখানি, মুখেভাত, খতনা, গায়েহলুদ, বিয়ে, ঈদ, মহররম, বর্ষবরণসহ বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এই খাবারগুলো অতুলনীয়।
হকদানা, ছাক্কা, ডিমের খাট্টা, কাঁঠালের বিচি দিয়ে কুকড়োর (মুরগি) মাংস, চুই ঝাল খাসির মাংস যশোর অঞ্চলের শত বছরের রান্নার ইতিহাসকে সমুজ্জ্বল রেখেছে।

ঘাটকোল:
যশোরের প্রায় সবার প্রিয় খাবার ঘাটকোল। প্রচলিত নাম ঘেঁটকচু। ঘাটকোল খাওয়া যায় নানা উপায়ে। ভর্তা, কাঁঠালের বিচি দিয়ে ঘাটকোল ভুনা, তেলের ওপর ঘাটকোল ভাজি।
গ্রীষ্ম-বর্ষা এ দুই ঋতুতে ঘাটকোলের কদর বেড়ে যায়। অনেকে মাছ-মাংসের বদলে ঘাটকোল ব্যঞ্জন দিয়েই ভূরিভোজ করে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর ঘাটকোলগাছ জন্মে। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য তাঁর ‘চিরঞ্জীব বনৌষধি’ গ্রন্থে ঘাটকোল সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এটি অতিশয় উত্তেজক, উদুরশুল নাশক, রক্তস্রাব নিবারক ও বিরোচক। বিষাক্ত সাপের কামড়ে মূল বেটে দংশিত স্থানে প্রলেপ ও কিছুটা খেতে দেওয়ার প্রচলন আছে। মৌমাছি, বোলতা, ভিমরুল, বিছায় কামড়ালে যন্ত্রণা উপশমে মূল বেটে দেওয়া হয়। ঘাটকোল খেলে পায়খানা পরিষ্কার হয়। রক্তস্রাব কমে। পেটের ব্যথা কমে।’ ঘাটকোলের ডাঁটাই সবাই খায়। তবে পাতা বেটে খাওয়ারও প্রচলন আছে।

ঘাটকোল-কাঁঠালের বিচি কষা:
এক আঁটি ঘাটকোল এক ইঞ্চি আকারে টুকরা করতে হবে। কয়েকটি কাঁঠালের বিচি কেটে নিতে হবে। ঘাটকোল ও কাঁঠালের বিচি সিদ্ধ করার পর কড়াইয়ে তেল, পরিমাণমতো হলুদ, লবণ, মরিচ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন বাটা দিয়ে খুব ভালো করে কষিয়ে নিতে হবে। এই ব্যঞ্জনটি গরম ভাতে অত্যন্ত উপাদেয়।
নারিকেল দুধে ঘাটকোল;
এক আঁটি ঘাটকোল ছোট টুকরা করে কেটে পানিতে সিদ্ধ করে রাখতে হবে। এরপর পরিমাণমতো তেল, হলুদ, লবণ, আদা, রসুন, শুকনা মরিচ বাটা দিয়ে সিদ্ধ করা ঘাটকোল কষিয়ে এক বাটি নারিকেলের দুধ দিতে হবে। নারিকেলের দুধ শুকিয়ে তেল বের হলে নামিয়ে গরম গরম পরিবেশন করতে হবে।

